সুগন্ধি চর্চার বিস্তার যেভাবে
সুগন্ধির ইংরেজি শব্দ হল- Perfume এই শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ Perfumare থেকে। বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘ধোঁয়ার মাধ্যমে’। অর্থাৎ ধোঁয়ার মাধ্যমে যে সুগন্ধ ছড়ানো হয় তাকে পারফিউম বলে। বর্তমানে পারফিউম বলতে যা দেখি বা বুঝি তা হচ্ছে সুদৃশ্য বোতলের ভেতর তেলজাতীয় এক প্রকার পদার্থ যা স্প্রে করে শরীরে কিংবা পোশাকে ছিটানো হয়।
সহস্র বছরের পুরনো এ সংস্কৃতি কিন্তু এখনও চালু আছে। এখনও আমরা মিলাদ কিংবা ধর্মীয় মাহফিলে আগরবাতি জ্বালিয়ে চারপাশ সুগন্ধময় করে তুলি। তাছাড়া সে সময় দেবতাদের উদ্দেশে নিবেদন করতে হতো দামি কোনো বস্তু যেমন- সোনা, রুপা কিংবা কোনো কোনো সংস্কৃতিতে মানুষের শিরশ্ছেদ। বেশিরভাগ মানুষই একাধারে ধর্মপ্রাণ ও বুদ্ধিমান এজন্য সোনা, রুপা কিংবা মানুষের মুণ্ডুর পরিবর্তে ধর্মভীরু মানুষ বেছে নিয়েছিল সুগন্ধি বস্তু। এতে করে একই সঙ্গে অর্থের কৃচ্ছতা সাধন ও ধর্মকৃত্য দুটোই সম্পন্ন হতো।
আরবদের হাত ধরেই ভারতবর্ষে সুগন্ধি চর্চার বিস্তার লাভ করে। একটি জিনিস মনে রাখতে হবে, ইসলামে সুগন্ধি চর্চার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। হজরত মোহাম্মদ (সা.) নিজে সুগন্ধি পছন্দ করতেন। নামাজে যাওয়ার আগে তিনি শরীরে সুগন্ধি লাগাতেন বিশেষ করে শুক্রবার জুমা-মোবারকে তিনি বিশেষ বিশেষ সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তার প্রিয় সুগন্ধি ছিল মাস্ক ও আম্বার। পরবর্তীতে মোগল আমলে সুগন্ধ চর্চার বিস্তার বেশ ব্যাপকভাবে ঘটে। বিশেষ করে মোগল সম্রাটরা সাধারণত পারস্য সম্রাটদের আদব, কায়দা, কেতা, স্বভাব ও ফ্যাশন অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। সে কারণে গোলাপ ও সৌরভের দেশ পারস্য থেকে আসত তাদের জন্য উৎকৃষ্ট আতর ও সুগন্ধি। এখানে বিশেষভাবে বলতে হয় আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক জ্যোর্তিবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ ও গণিতবিদ ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) পরিপূর্ণ ও স্বার্থক পারফিউম আবিষ্কার করেন। তাকেই বলা যায় আধুনিক অর্থাৎ আমরা যে ধরনের পারফিউম বর্তমানে ব্যবহার করি তার জন্মদাতা।
বিখ্যাত পর্যটক আলবেরুনী ভারতীয়দের প্রসাধন চর্চা প্রসঙ্গে লিখেছেন- উৎসবের দিনে তারা তাদের দেহে সুগন্ধির বদলে গোবর লেপে। মেয়েদের সাজ-পোশাকের জিনিস পুরুষরা পরে। তারা তাদের শরীরের কোনো চুল কাটে না। আসলে, গরমের প্রভাব থেকে তারা নগ্নভাবে চলাফেরা করে। আর মাথার চুল না কাটার মূল কারণ হল সর্দি-গর্মির কবল থেকে আত্মরক্ষা করা। এক গুচ্ছের আকারে তারা তাদের গোঁফ রাখে। নখ না কেটে তারা তাদের কুড়েমিকে মহিমান্বিত করে। এ দেশিরা একের পর এক, একা একা ভোজন করে। গোবরের প্রলেপ দেয়া স্থানে তারা একাজ সমাধান করে। (আলবেরুনী-প্রেমময় দাশগুপ্ত কর্তৃক অনুদিত, পৃষ্ঠা- ৫০ ও ৫১)। আলবেরুনী ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক তার প্রণীত ভারততত্ত্ব গ্রন্থটি ইতিহাসের আলোকে বেশ প্রণিধানযোগ্য।
সারা বছরই সুগন্ধি ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। গ্রীষ্মকালে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। কারণ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শরীরের ঘামের উৎকট গন্ধ থেকে সুরক্ষা দেয়। বিশ্বের সব নারী-পুরুষ সুগন্ধি ব্যবহার করে থাকেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ব্যবহার করে থাকেন, কারণ নারীরা ফ্যাশনে খুব সচেতন। নারীদের সুগন্ধি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কিছু থাকে নিত্যদিনের জন্য, কিছু থাকে কোনো বিশেষ দিনের জন্য, যেমন—জন্মদিন, বিয়েসহ নানা প্রোগ্রামে। পুরুষদের মধ্যে যারা নিজের প্রতি সচেতন এবং নিজেকে অন্যের কাছে উত্তমরূপে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন তারা সুগন্ধির ব্যবহার পছন্দ করেন। সুগন্ধি ব্যবহারকারী দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে সুগন্ধি ছাড়া চলেই না। সুগন্ধি ছাড়া যেন সাজই অসম্পূর্ণ থাকে।
কোন মন্তব্য নেই