ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ
ক্যান্সার শরীরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিভাজনের কারণে সৃষ্ট একটি রোগ। যদি এই অস্বাভাবিক কোষগুলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি ক্যান্সারের টিউমার তৈরি করতে পারে এবং আশেপাশের টিস্যুতে আক্রমণ করতে পারে।
ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলি প্রায়শই সূক্ষ্ম এবং অন্যান্য সাধারণ অবস্থার সাথে মিশে যেতে পারে। তবে, আপনার শরীরে যেকোনো পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ যা স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
ক্যান্সারের কিছু লক্ষণ আছে, যেটি মানুষ নিজের অজান্তেই এড়িয়ে যায়। অথচ রোগবালাই শুরুতে ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়। একেবারে শুরুর দিকে শনাক্ত করা গেলে সব ক্যান্সারই সারিয়ে তোলা সম্ভব। যদি অনেক পরে ধরা পড়ে, তখন আর সারানো সম্ভব হয় না। উপসর্গগুলোর ব্যাপারে সবাই একটু সচেতন হলে ক্যান্সারের চিকিৎসায় অনেক বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি হয়তো সুস্থ জীবনযাপন করছেন, কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল তাঁর ক্যান্সার হয়েছে। এর মধ্যে তাঁর কিছু লক্ষণও হয়তো শরীরে দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো তিনি বুঝতে পারেননি, অথবা গুরুত্ব দেননি।
পরে দেখা গেল বিলম্ব করার কারণে ক্যান্সার ইতোমধ্যে তাঁর শরীরে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। তখন চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁকে সারিয়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিচের ১০টি লক্ষণ দেখা দিলে কখনোই অবহেলা করবেন না।
কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া
ক্যান্সার আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষই কোনো না কোনো সময় ওজন হারাতে শুরু করেন। যখন আপনি কোনো কারণ ছাড়াই ওজন হারাতে থাকেন, তখন এটিকে বলা হয়, ব্যাখ্যাহীন ওজন হারানো। এতে চিন্তার কারণ আছে।
ব্যাখ্যাহীনভাবে বা কোনো কারণ ছাড়াই পাঁচ কেজি বা এর বেশি ওজন কমলে, সেটি ক্যান্সারের প্রথম লক্ষণ হতে পারে।
অগ্ন্যাশয়, পাকস্থলী, খাদ্যনালি বা ফুসফুসের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ওজন কমে যাওয়ার এই লক্ষণ বেশি দেখা যায়।
জ্বর
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সবচেয়ে সাধারণ একটি উপসর্গ হচ্ছে জ্বর। অবশ্য যে স্থানে ক্যান্সার উৎপন্ন হয়েছে, সেখান থেকে দেহের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়া শুরু হলে তখন প্রায়ই জ্বর দেখা দেয়।
ক্যান্সারে আক্রান্ত সবাই কোনো না কোনো সময় জ্বরে ভোগেন। বিশেষ করে, যদি ক্যান্সার বা এর চিকিৎসা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে জ্বর বেশি হয়।
অনেক ক্ষেত্রে জ্বর ক্যান্সারের প্রাথমিক উপসর্গও হতে পারে। যেমন লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমা।
ক্লান্তি
এখানে ক্লান্তি বলতে বোঝায় চরম ক্লান্তিভাব, যা বিশ্রাম নেওয়ার পরও দূর হয় না। ক্যান্সার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
কিছু কিছু ক্যান্সার, যেমন– লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে শুরুর দিকেই ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
কোলন বা মলাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রক্তপাত হতে পারে, তবে এটা সব ক্ষেত্রে হয় না। এর কারণেও ক্যান্সারের সময় ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
ত্বকে পরিবর্তন
ত্বকের ক্যান্সার ছাড়াও আরও কিছু ক্যান্সার রয়েছে, যাতে আক্রান্ত হলে ত্বকে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণ ও উপসর্গের মধ্যে রয়েছে:
ত্বক কালো হয়ে যাওয়া বা হাইপারপিগমেনটেশন
ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস
ত্বক লাল হয়ে যাওয়া। চুলকানি
মাত্রাতিরিক্ত চুলের বৃদ্ধি
অন্ত্রের ক্রিয়া বা মূত্রাশয়ের কার্যক্রমে পরিবর্তন
কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া বা আপনার মলের আকারে দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তন মলাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
অন্যদিকে প্রস্রাব করার সময় ব্যথা, প্রস্রাবে রক্তপাত, বা মূত্রাশয়ের কার্যক্রমে পরিবর্তন যেমন– আগের তুলনায় কম বা বেশি প্রস্রাব করা ইত্যাদি মূত্রাশয় বা প্রোস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
যে ক্ষত ভালো হয় না
অনেকেই জানেন, দেহে যদি আঁচিল থাকে যেটি বাড়ে বা ব্যথা হয় বা সেটি থেকে রক্তপাত হয়, তাহলে সেটি ত্বকের ক্যান্সারের একটি লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু শরীরে যদি কোনো ক্ষত থাকে, যেটি চার সপ্তাহের পরও ভালো হয় না বা সেরে যায় না, এমন ক্ষতের প্রতিও আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত।
মুখে যদি এমন কোনো ক্ষত হয়, তাহলে সেটি মুখের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
আপনার মুখের যে কোনো পরিবর্তন যদি দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তাহলে আপনাকে অবশ্যই একজন চিকিৎসক বা ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশ্ন বা জরায়ুতে ক্ষত হয়ে কোনো ধরনের সংক্রমণ কিংবা ক্যান্সারের প্রাথমিক অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রক্তপাত
ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় কিংবা তা ছড়িয়ে পড়ার পর অস্বাভাবিক রক্তপাত হতে পারে। কাশির সঙ্গে রক্তপাত ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি মলের সঙ্গে রক্তপাত হয় তাহলে এটি মলাশয় বা মলদ্বারে ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
এনডোমেট্রিয়াম বা জরায়ুর আবরণে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের কারণে যোনিপথে অস্বাভাবিক রক্তপাত হতে পারে।
এ ছাড়া মূত্রের সঙ্গে রক্ত পড়লে সেটি মূত্রাশয় বা কিডনি ক্যান্সারের কারণে হতে পারে। স্তনবৃন্ত বা স্তনের বোঁটা থেকে রক্ত-মিশ্রিত তরল বের হলে, সেটি স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
শরীরের যে কোনো স্থান শক্ত হয়ে যাওয়া
অনেক ক্যান্সার ত্বকের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে। এ ধরনের ক্যান্সার সাধারণত স্তন, অণ্ডকোষ, গ্রন্থি এবং শরীরের নরম টিস্যুতে হয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে দেহে শক্তভাব বা মাংস জমে আছে– এ ধরনের অনুভূতি হয়। এটা এসব ক্যান্সারের প্রাথমিক বা বিলম্বিত উপসর্গ হতে পারে।
গিলতে অসুবিধা
ক্রমাগত বদহজম বা কোনো কিছু গিলতে গেলে সমস্যা হলে সেটি পাকস্থলী বা গলার ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
তবে যাই হোক না কেন, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব উপসর্গই ক্যান্সার ছাড়াও অন্য আরও অনেক কারণে দেখা দিতে পারে।
টানা কাশি বা কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন
টানা কাশি ফুসফুসের ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। তিন সপ্তাহের বেশি সময় কাশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন এলে তা স্বরযন্ত্র বা থাইরয়েড গ্রন্থিতে ক্যান্সারের উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে। v
[সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন, পপুলার মেডিকেল কলেজ]
তথ্যসূত্র : বিবিসি

কোন মন্তব্য নেই